ঐক্য প্রক্রিয়ায় বিএনপির নতুন প্রস্তাব উত্থাপিত!

0
17

ঢাকাঃ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে ঐক্য প্রক্রিয়ায় নতুন প্রস্তাব তোলা হয়েছে। রবিবার রাতে যুক্তফ্রন্ট-জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও বিএনপির বৈঠকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবে বলা হয়- চলমান ঐক্য প্রক্রিয়ায় ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াতকে বাদ দিয়ে ১৯টি দলকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কী না। যদিও বৈঠকে পরিষ্কারভাবে এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

রবিবার (৭ অক্টোবর) রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বাসায় যুক্তফ্রন্ট-জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও বিএনপি নেতাদের বৈঠক হয়। বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রস্তাব করে বলেন, ‘আমরা তো ১৯টি দলকে বাইরে রাখতে পারি না। সেক্ষেত্রে তাদের নেওয়া যায় কী না, সেটা দেখছি।’

বৈঠকে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক নেতারা এ বিষয়ে কোনও জবাব না দিলেও বিষয়টিকে তারা নতুন হিসেবে দেখছেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার দুই নেতা জানান, এটা বিএনপির নতুন প্রস্তাব। আমরা এতদিন পরিষ্কার ছিলাম যে, জাতীয় ঐক্যে শুধু বিএনপি যুক্ত হবে এবং তাদেরকে সামনে রেখেই ঐক্য কার্যকর হবে। সেক্ষেত্রে তাদের জোটের বিষয়টি উত্থাপন করা একেবারে নতুন।

বৈঠকে যুক্তফ্রন্টের আসম আবদুর রব, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না, তানিয়া রব, মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মোস্তফা মহসীন মন্টু, আবম মোস্তফা আমীন, সুলতান মনসুর আহমদ এবং বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল, খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অংশ নেন। গত মাসের শেষ দিকে যুক্তফ্রন্টের বৈঠকে বিএনপি মহাসচিবের পক্ষে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অংশ নেন।

বৈঠকের শুরুতে মওদুদ আহমদ ঐক্য প্রক্রিয়াকে কার্যকর করে মাঠে নামার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘ঐক্য প্রক্রিয়াকে কার্যকর করে রাজপথে আন্দোলনে নামা দরকার।’

যদিও যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে আবদুল মান্নান ‘ঐক্য প্রক্রিয়া এগুবে কোন ভিত্তিতে’ এমন প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে বিষয়টি আর এগোয়নি। বিশেষ করে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠন-এই তিনটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না করে ঐক্য কার্যকর লক্ষ্যের দিকে এগুবে না, এমনটি মনে করছেন যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা।

বৈঠকের মাঝামাঝি সময়ে মওদুদ আহমদ, আসম রব ও সুলতান মনসুর আহমদের কণ্ঠে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করা এবং আগামী দিনে যেকোনও কর্মসূচি যুগপৎভাবে পালন করার বিষয়টি একসুরে প্রতিফলিত হলেও আদতে ঐক্যের সবচেয়ে বড় বিষয়টি অনেকটাই অনালোচিত রয়ে গেছে। বিশেষ করে ভারসাম্যের বিষয়টি নিয়ে এতদিন ধরে কথা হচ্ছে, সে বিষয়টি সম্পর্কে বিএনপি এখনও দলীয় সিদ্ধান্ত জানায়নি। আর এ কারণেই আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠন সম্পর্কে আলোচনা আরও কয়েকদিন চলবে।

এ বিষয়ে সোমবার সন্ধ্যায় আসম রবের উত্তরার বাসায় আবারও বৈঠকে মিলিত হবেন যুক্তফ্রন্ট-জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও বিএনপির নেতারা। এই বৈঠকে এ বিষয়গুলো সম্পর্কে আলোচনা করবেন নেতারা। এক্ষেত্রে যুক্তফ্রন্টের তরফে পরিষ্কারভাবেই দেড়শ আসনের বিষয়টির ‍ওপর জোর দেওয়া হবে। যদিও ইতোমধ্যে বিএনপির তরফে ১০০ আসন দেওয়ার কথা বলা হলেও, তাতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিকল্প ধারার মহাসচিব আবদুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আলোচনা শুরু হয়েছে। কর্মসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। ধাপে-ধাপে বিষয়গুলো ওঠে আসবে। কথা আরও বাকি আছে। সেগুলো বলা হবে, এরপর বলা যাবে চূড়ান্ত কী হল।’

সুলতান মনসুর আহমদ বলেন, ‘প্রত্যাশামতো এগিয়ে যাচ্ছে। আরও এগুবে।’

মাহমুদুর রহমান মান্না জানালেন, ‘সোমবার আসম রবের বাসায় আবারও বৈঠক হবে। সেখানে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে।’

বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানান, রবিবার রাতের বৈঠকে যুক্তফ্রন্ট-জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ৫ দফার সঙ্গে বিএনপি একমত হয়েছে। সেখানে প্রথম দফায় রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দাবির বিষয়টির শুরুতে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। যদিও যুক্তফ্রন্টের আসম রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ কয়েকজন নেতা বিএনপির চেয়ারপারসনের মুক্তির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সভায় প্রসঙ্গ ধরে তুলেছেন। রবিবার বিএনপির সঙ্গে বিষয়টি দ্বিরুক্তি হল কেবলমাত্র।

জেএসডির উপদেষ্টা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানান, ‘আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক করার স্বার্থে যুক্তফ্রন্ট-জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ৫ দফার সঙ্গে বিএনপি একমত হয়েছে। আজকে আমরা শুধু খালেদা জিয়াসহ রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি চাই, এ বিষয়টি যুক্ত করলাম। এখন দরকার লক্ষ্যগুলো ঠিক করা। আমাদের আগে থেকে ৯ দফা লক্ষ্য আছে, বিএনপির ১২টি। এখন এগুলো সমন্বয় করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

সাংবাদিকদের আসম রব বলেন, ‘নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আমরা যে ৫ দফা দিয়েছি, তার সঙ্গে আজকের বৈঠকে সবাই ঐকমত্যে পৌঁছেছি। আমরা আগামীতে আন্দোলনের কর্মসূচি ঠিক করব, একসঙ্গে বসেই।’

গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রেসক্লাবে ঘোষিত যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্যের দাবিগুলো হলো- ১. আসন্ন জাতীয় একাদশ সংসদ নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা অর্থাৎ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগেই বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। ২. অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। ৩. ‘কোটা সংস্কার’ এবং ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র-ছাত্রীসহ সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে এবং গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দিতে হবে। এখন থেকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা যাবে না। ৪. নির্বাচনের একমাস আগে থেকে নির্বাচনের পর ১০ দিন পর্যন্ত মোট ৪০ দিন প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করতে হবে। ৫. নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের চিন্তা ও পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর যুগোপযোগী সংশোধনের মাধ্যমে গণমুখী করতে হবে এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।

এই দাবিগুলোকে সামনে রেখে আগামী দিনে একসঙ্গে জনসভার মাধ্যমে তুলে ধরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে। এ বিষয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আলাদা-আলাদা না করে সবাই একত্রে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে কথা বলব।’বৈঠকেও জাফরুল্লাহ চৌধুরী জোর দেন ঐক্যের ওপর এবং তা বাস্তবায়নের ওপর।

রবিবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে দশটার দিকে বৈঠকের মাঝামাঝি সময়ে সাংবাদিকদের ডেকে কথা বললেও বৈঠক শেষ হয় রাত ১১টায়। অংশ নেওয়া রাজনীতিকদের স্বরচিত গ্রন্থ উপহার দেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বৈঠক শেষে আমন্ত্রিত নেতাদেরকে আপ্যায়ন করা হয়।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে মওদুদ আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে।’

উল্লেখ্য, রবিবারের বৈঠকে ড. কামাল হোসেন ও বি চৌধুরী অংশগ্রহণ করেননি।

এদিকে, বিএনপির নেতার বাসায় যখন ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে, একই সময়ে বারিধারায় সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরীর ভাতিজা অপু চৌধুরীর আমন্ত্রণে তার বাসায় ডিনার পার্টি অনুষ্ঠিত হয়। ওই পার্টিতে অংশ নেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাট, ফয়েজ সোবহান ও তার স্ত্রী, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, মার্কিন দূতাবাসের কনসুলার শ্যারন এ ওয়েভার ও বিকল্প ধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী প্রমুখ।

এ বিষয়ে মাহী বি চৌধুরী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এটা পারিবারিক অনুষ্ঠান ছিল।’
সুত্রঃ banglatribune/ জাগো নিউজ//

Leave a Reply