ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, আন্দোলন চলবে-কোটা সংস্কার

0
29
সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে গতকাল সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল–সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। দুপুরে টিএসসি এলাকায় স্লোগান দেন এক ছাত্রী। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ
  • প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন।
  • আটক আন্দোলনকারীদের মুক্তি দাবি।
  • আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করারও দাবি।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। দাবি আদায়ে আজ বুধবার থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি পালন করবেন তাঁরা। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীরা দেশজুড়ে সড়ক অবরোধ অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার এই ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে আটক আন্দোলনকারীদের সবার মুক্তি এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছে তারা।

কোটা সংস্কারে আন্দোলনকারীদের জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে সম্বোধন এবং আগামী বাজেটের আগে কোটা সংস্কার সম্ভব নয় বলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই এমন ঘোষণা আসে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, সোমবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠকে তাঁরা আন্দোলন আগামী ৭ মে পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের দুই মন্ত্রীর এমন মন্তব্যের কারণেই তাঁরা আর আস্থা রাখতে পারছেন না।

সচিবালয়ে বৈঠক শেষে গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজু ভাস্কর্যে ফিরে এসে ছাত্র প্রতিনিধিরা যখন আন্দোলন ৭ মে পর্যন্ত স্থগিতের কথা জানান, তখনই একটি পক্ষ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। গতকাল প্রায় দিনভর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল-সমাবেশ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস হয়নি।

ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে বিকেল পাঁচটার মধ্যে মতিয়া চৌধুরীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু এমন ঘোষণা না আসায় সন্ধ্যায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা আসে এবং দুই পক্ষই এক হয়ে যায়।

গতকাল ওবায়দুল কাদের ছাড়াও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ কয়েকজন মন্ত্রী কোটা সংস্কার ও ছাত্র আন্দোলন নিয়ে পৃথক বক্তব্য দেন। রাতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে ওবায়দুল কাদের বলেন, কোটা সংস্কারের বিষয়ে অন্য কেউ যদি কিছু বলে থাকেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত মতামত। তিনি বলেন, সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, আগামী ৭ মের মধ্যে কোটা সংস্কারের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

উল্লেখ্য, গত ৯ মে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধিদল বৈঠক করে। এ সময় কোটা সংস্কারের বিষয়টি পর্যালোচনা করতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন বলে আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করা হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা থামেনি।

এর আগে কোটা সংস্কারসহ পাঁচ দফা দাবিতে ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নিয়ে আসা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ পরীক্ষা না নেওয়া, সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা এবং চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করার দাবিতে তাঁদের এই আন্দোলন।

আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৮ এপ্রিল ছিল সারা দেশে গণপদযাত্রা কর্মসূচি। এই কর্মসূচিতে পুলিশ হামলা চালানোয় আন্দোলনকারীরাও সহিংস হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারী নিহত হয়েছেন-এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে রাত একটার দিকে একদল যুবক উপাচার্যের বাসভবনে ব্যাপক হামলা চালান এবং অগ্নিসংযোগ করেন।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও গতকাল চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর মন্তব্য এবং অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে তাঁরা এই কর্মসূচি পালন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কর্মসূচি পালন করেন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। গতকাল ঢাকায় সাতটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে যোগ দেন। ফলে শহরজুড়ে ছিল যানজট।

ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সিদ্ধান্ত জানতে গতকাল বিকেল পাঁচটা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁরা মতিয়া চৌধুরীর বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. রাশেদ খান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ ফুঁসে উঠেছে। তারা চায় না এক মাস সময় নেওয়া হোক। তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও মানে না। তিনি আরও বলেন, আজ বুধবার থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং জেলা পর্যায়ে যেসব কলেজ আছে, সেগুলোতে ক্লাস-পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। যত দিন পর্যন্ত দাবি মেনে না নেওয়া হবে, তত দিন এই কর্মসূচি চলতে থাকবে এবং সারা দেশে প্রতিদিন অবরোধ করা হবে।

ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আলোচনার সময় বলেছিলেন, আন্দোলন এক মাস স্থগিতের সিদ্ধান্ত রহিত হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল হক বলেন, বৈঠকে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের অনুরোধে আগামী ৭ মে পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখতে সম্মতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সচিবালয়ে যখন বৈঠক চলছে, ঠিক ওই মুহূর্তে জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী সারা দেশে আন্দোলনকারীদের ৮০ শতাংশ রাজাকারের বাচ্চা বলে মন্তব্য করেন। আবার অর্থমন্ত্রী আজ (গতকাল) বলেছেন, বাজেটের আগে কোটা সংস্কার সম্ভব নয়। অর্থাৎ বৈঠক হলেও পরদিন আবার বিপরীত বক্তব্য আসছে।

নূরুল হক আরও বলেন, বৈঠকে গ্রেপ্তার সবাইকে মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছিল আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে, কিন্তু এ নিয়েও কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।

তবে গতকাল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের দেখতে যান।

এদিকে পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার প্রথম আলোকে বলেন, আটক শিক্ষার্থীদের সোমবারই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া এ ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত মামলা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীকে কোটা সংস্কার নিয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নূরুল হক বলেন, ‘আপনি দয়া করে আপনার সন্তানদের বিপদের সম্মুখীন করবেন না, রাস্তায় ছেড়ে দেবেন না। আপনি একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেন যে আমরা কোটা এত শতাংশ রাখব। কেবলমাত্র সুনির্দিষ্ট ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের আন্দোলন স্থগিত করা হবে।’

শিক্ষার্থীদের এই সংবাদ সম্মেলন যখন চলছিল, তখন ৬টা ১০ মিনিটের দিকে একটি ড্রোন ওপরে উড়তে দেখা যায়। শিক্ষার্থীরা তখন সমবেতভাবে ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। ড্রোনটি ১০ মিনিটের মতো ওই স্থানে ছিল। এরপর সেটি আবার উধাও হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা এরপর মিছিল বের করেন। মিছিলটি টিএসসি, পলাশী মোড় ও নীলক্ষেত হয়ে আবার টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে এসে সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্ম হয়।

এ সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে আজ সকাল ১০টায় সবাইকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। গতকাল রাত আটটায় তাঁরা কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেন। এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শিক্ষার্থীরা মতিয়া চৌধুরীর কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। সুত্রঃ প্রথম আলো।

Leave a Reply