তফসিলের আগেই সংলাপে বসার আহ্বান জানাবে ঐক্যফ্রন্ট!

0
18

সিলেটঃ অবশেষে আজ বুধবার সিলেটে জনসভা করছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত এই নতুন জোট আজ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নামছে।

জনসভা থেকে আগামী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ঘোষিত সাত দফা দাবি মানতে সরকারকে সংলাপে বসার আহ্বান জানাবেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। একই সঙ্গে আন্দোলনের কর্মসূচি আসতে পারে। নগরীর ঐতিহ্যবাহী রেজিস্টারি মাঠে দুপুর ২টায় এই জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। চলমান ‘গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার পুনরুদ্ধারে’র আন্দোলনে এই জনসভা নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করছেন সরকারবিরোধী দলগুলোর নেতারা। এ জনসভায় ব্যাপক জনসমাগম করার টার্গেট নিয়েছেন বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তবে গত রাতে পুলিশ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকে আটকের পর এ নিয়ে শহরে কিছু উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া ১৪ শর্তে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করবেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পৌনে ৫টায় ঢাকা থেকে বিমানযোগে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। সমকালকে তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য এই সমাবেশ আহ্বান করা হয়েছে। এটা জনগণের দাবি এবং জনগণ এসেই তাতে সমর্থন দিয়ে যাবে। এদিকে রাত ৮টার দিকে ড. কামাল হোসেন হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজার এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর কবর জিয়ারত করেন। এ সময় ঐক্যফ্রন্টের কয়েকজন নেতা তার সঙ্গে ছিলেন। রাত ১১টার দিকে নগরীর রোজভিউ হোটেলে যাওয়ার সময় ঐক্যফ্রন্ট নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে উদ্দেশ করে স্লোগান দিয়ে কয়েক যুবক হামলার চেষ্টা চালায়। সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ এ হামলা চেষ্টার কথা জানান।

জনসভায় প্রধান বক্তা থাকবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সভাপতিত্বে করবেন বিএনপি নেতা সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ ছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা বক্তৃতা করবেন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক কয়েকটি দলের নেতারাও বক্তৃতা করতে পারেন। গতকাল রাতেই ঢাকা থেকে বিজেপির সভাপতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিমসহ জমিয়তে ওলামা ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের নেতারা সিলেটে আসছেন।

জনসভা সম্পর্কে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, জনসভা থেকে সরকারকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সাত দফা দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাবেন তারা। আশা করি, সরকার শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবে। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমাদের যাত্রা শুরু হলো। বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলতে থাকবে। তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাসী; কোনো সংঘাত চান না।

গতকাল বিকেলে ড. কামাল হোসেন ছাড়াও সিলেটে জনসভার সমন্বয়ক সুলতান মনসুরসহ ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের অনেকে সিলেটে এসে পৌঁছান। এদের মধ্যে বিএনপির স্থ্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বিএনপির সহসভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান, যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লাহ বুলু, জয়নাল আবেদীনসহ অগ্রগতি দলের নেতারা ছিলেন। গত রাতে সিলেটের প্রস্তুতি সভায় অংশ নেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ শাহজাহান সমকালকে বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বিপুল লোকসমাগম করতে তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আজ সকালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ঐক্যফ্রন্টের বাকি নেতারা পৌঁছাবেন বলে সমকালকে জানিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের স্থানীয় কর্মসূচি সমন্বয়ক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ। সিলেটে ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম বলেন, সিলেটের জনসভা থেকে সরকারকে নতুন বার্তা দেওয়া হবে। এরই মধ্যে জনসভা সফলে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, আজ জনসভার আগে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণ (রহ.) মাজার এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর কবর জিয়ারত করবেন।

এদিকে, আজকের জনসভাকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িতে গিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি নেতারা। গতকাল নগরীতে সমাবেশের প্রচারে মাইকিং করতে গেলে পুলিশ তা ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করেন জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম। তিনি সমকালকে বলেন, গত কয়েকদিন ধরে সাদা পোশাকের পুলিশ নেতাকর্মীদের বাসাবাড়ির চারদিকে অবস্থান নিয়ে আছে। ফলে অনেকেই বাসাবাড়িতে থাকতে পারছেন না। অনেক নেতাকর্মীকে পুলিশের পক্ষ থেকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার পরিতোষ ঘোষ এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে সমকালকে বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। এমনকি মাইকিংয়ে বাধা দেওয়ার অভিযোগও কেউ করেনি। আজকের জনসভা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আশা করি শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ হবে। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থাকবে বলে জানান তিনি।

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় নগরীর কোর্ট পয়েন্ট থেকে জনসভার প্রচারে লিফলেট বিতরণ করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এম এ হক, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন মিলন, জেলার সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ, মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আজমল বখত সাদেকসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। এ ছাড়া দুপুরে বিএনপির শীর্ষ নেতারা নগরীর রেজিস্টারি মাঠে সমাবেশস্থলের সর্বশেষ প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা ও সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাকসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

গত ১৬ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রথম বৈঠক শেষে ২৩ অক্টোবর সিলেটে জনসভার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে তাতে সায় দেয়নি প্রশাসন। এরপর ২৪ অক্টোবর জনসভা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ অবস্থায় সমাবেশের অনুমতি চেয়ে গত রোববার উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ। রিট আবেদনের দিনই মহানগর পুলিশ শর্তসাপেক্ষে জনসভার অনুমতি দেয়। তার আগে গত শনিবার ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে প্রশাসনকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদ বাতিল, নিরপেক্ষ সরকার গঠন ও খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার; নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন; নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার না করা; গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্ব্বাধীনতা ও নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের সাত দফা দাবিতে এই জনসভার ডাক দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে সিলেট মহানগর গণফোরাম সভাপতি আনসার খান সমকালকে বলেন, এই সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।

গত ১৩ অক্টোবর গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ হয়। সিলেটে আজকের জনসভার পর চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে জনসভা করার কথা রয়েছে। তবে সিলেটের এই জনসভাকে নিজেদের প্রথম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। ফলে শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ আয়োজনের পাশাপাশি বড় ধরনের শোডাউনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জনসভার অনুমতি দেওয়ার পর থেকে সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়। স্থানীয়ভাবে ঐক্যফ্রন্টের অন্য শরিক দলের সাংগঠনিক অবস্থা তেমন শক্তিশালী না হওয়ায় মূলত বিএনপির নেতাকর্মীদেরই মাঠে সক্রিয় দেখা গেছে।

সিলেট জেলা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মিনহাজ গাজী বলেছেন, মানুষ ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বক্তব্য শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আজমল বখত সাদেক সমকালকে বলেছেন, আজকের জনসভা থেকে সরকারকে বিশেষ বার্তা দেওয়া হবে।

বিএনপির নেতাকর্মী আটক :এদিকে ঐক্যফ্রন্টের জনসমাবেশের আগের রাতে নগরীর সুবহানীঘাটে জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীমের বাসার সামনে থেকে বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া নগরীর উপশহরে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের অবস্থানকারী হোটেলের সামনে থেকে ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতাকর্মীকে আটকের কথা জানিয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ। সব মিলিয়ে ২০-২৫ জনকে আটকের দাবি করেছেন তিনি। এদের মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী ও মহানগর বিএনপির সহসভাপতি, সিটি কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। জেলা বিএনপির বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাদের আটক করা হয়।

কোতোয়ালি থানার সহকারী কমিশনার গোলাম কাওসার দস্তগীর জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনজনকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। তবে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (ক্রাইম) জ্যোতির্ম্ময় সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটকের কথা নিশ্চিত করতে পারেননি। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সেলিম মিয়া জানিয়েছেন, পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলছে। জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম জানিয়েছেন, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ তার বাসায় শান্তিপূর্ণ সভা করছিলেন। এ সময় বাসার সামনে থেকে এবং বিভিন্ন স্থান থেকে ২০-২৫ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। এই ঘটনার পর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেকে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন।।

// সুত্রঃ সমকাল অনলাইন//

Leave a Reply