তরুণ ডাক্তারদের অবস্থা খুবই করুণ!

0
18
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবায় চিকিৎসকরা

বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা শতাধিক। এতো ছোট ভূখণ্ডে এতো মেডিকেল কলেজ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এখনই প্রতি বছর সাত হাজারের কাছাকাছি ডাক্তার বের হন। দুই বছর পর বছরে ১০ হাজারের বেশি ডাক্তার বের হবেন। গত পঞ্চাশ বছরে মোট ডাক্তার নিবন্ধিত হয়েছেন প্রায় ৮০ হাজার। আগামী দশ বছরেই বের হবে আরো ১ লাখ ডাক্তার। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত জেলায় জেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি তো আছে।

সঙ্গত কারণে এতো ডাক্তারের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এই দরিদ্র দেশে সম্ভব না। প্রতিটি তরুণ ডাক্তার ইন্টার্নশিপ শেষ করার পরের দিন থেকে এই নির্মম সত্যের মুখোমুখি হয়। চাহিদার চেয়ে যোগান বেশি হওয়ায় এই তরুণ ডাক্তারদের অবস্থা হয় খুবই করুণ।

এই তরুণ ডাক্তার অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, জীবনের নানা মঞ্চে মেধাবী হিসেবে মূল্যায়িত হওয়া, টিউশনি থেকে শুরু করে আত্মীয় মহলে দাম পাওয়া এই তরুণের এই চলমান বাংলাদেশের বাজারে কোনো দাম নেই। ক্লিনিকের মেট্রিক পাশ ম্যানেজার থেকে শুরু করে কিংবদন্তীতুল্য প্রফেসর, সবার চোখে সে তুচ্ছ।এই তুচ্ছতার অনুভূতি বুকে নিয়ে প্রতিনিয়ত সে ক্ষতবিক্ষত হয়, এই রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয় আর এই অনুভূতিগুলোকে সে উগরে দেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে।

সব মেধাবীরা নিশ্চয়ই ডাক্তার হয় না, আর সব ডাক্তারই নিশ্চয়ই মেধাবী নয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো মেধাবী শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই ডাক্তার হন। এই মেধাবীদের তারুণ্যের সুন্দর সময়গুলো কুরে কুরে কেটে খাচ্ছে বিষাক্ত সরীসৃপের মতো কুটিল হতাশা আর ব্যর্থতার অনুভূতি।মেধা অনেকটা জেনেটিক্যাল হলেও এটা চর্চা ছাড়া টিকে থাকেনা। হতাশা এবং ব্যর্থতার অনুভূতি যাদের সারাক্ষণ কুরে কুরে খায়, মেধা তাদের মধ্যে বেশিদিন বসত গেড়ে থাকে না।এভাবেই বাংলাদেশের মেধার একটা বিরাট অংশ অপচয় হয়ে যাচ্ছে।

অথচ আমাদের মেডিকেল পড়ুয়া তারুণ্যের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করলেই এই হতাশা আর ব্যর্থতাকে দূরে ছুড়ে ফেলা যায়।সন্দেহ নেই, এরকম হতাশার পরিস্থিতির মাঝেও সবচেয়ে মেধাবীরা এগিয়ে যাবে এবং চিকিৎসাবিদ্যার চর্চার মাধ্যমেই একটা ভাল অবস্থানে চলে যাবে। কিন্তু গাণিতিক হিসেবের কারণেই একটা বিরাট অংশ চিকিৎসা পেশায় সাফল্য লাভ করতে পারবে না। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হতাশার গল্প না ছড়িয়ে তরুণ চিকিৎসকদের একটা অংশের নিজ পেশার ব্যর্থ অহমিকায় না ভুগে পেশা পরিবর্তন বা অন্য দেশে চলে যাওয়া উচিৎ।

মেডিকেলের পাশাপাশি সারা দেশের সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে একটা বিশাল সংখ্যক প্রকৌশলীও বের হন। এরা যে নিজ পেশার চর্চার মাধ্যমে বাংলাদেশে খুব ভালো অবস্থায় আছে তা কিন্তু না। এদের সবচেয়ে মেধাবী ও চতুর অংশটি প্রথম সুযোগেই বরফের দেশে চলে গেছে। বাকিদের অধিকাংশই সমাজের মেইনস্ট্রিম অন্যান্য পেশায় চলে গেছে। এদের এই স্মার্ট মুভকে আমি সম্মান করি। প্রতিনিয়ত নানারকম কাদুঁনি না গেয়ে, নিজেদের জীবনকে নিজেদের মতো সাজিয়ে নিয়েছে।

চিকিৎসাবিদ্যায় পড়ালেখা শেষ করা তরুণদের মধ্যে অনেকেরই দেখি এই পেশার প্রতি খুব বেশী ভালোবাসা নাই। অনেকেই নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে মানুষের সেবার নামে আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত আছেন।এভাবে জীবন যাপন করা যায় না।

তরুণ চিকিৎসকদের উচিত,যাদের এই পেশার প্রতি সন্মানবোধ আছে, যারা এই পেশায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাদের এই পেশায় থাকা। আর এই পেশার প্রতি খুব বেশি প্যাশন না থাকলে, শুধু শুধু ব্যর্থ দৌড়ের চেষ্টা না করা। আপনি যদি মেধাবী হয়ে থাকেন, তবে চেষ্টা করলে যে কোনো পেশায় আপনি ভালো করতে পারবেন।

একজন সফল চিকিৎসকের চাইতে একজন সফল ব্যবসায়ী, একজন সফল আমলা, একজন সফল সাহিত্যিকের জীবন কম বর্ণময় নয়। জীবন অনেক বিশাল, অনেক চমৎকার। সাদা এপ্রোন আর স্টেথো ছাড়াও একজন মেধাবী নিজের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারেন। শুধু শুধু পেশাগত অহমিকা আর সমাজের চাপের কারণে ব্যর্থ জীবন অতিবাহিত করার কোনো মানে হয় না।

লেখক: ডা. শরীফ উদ্দিন, সার্জারি বিভাগে উচ্চতর প্রশিক্ষণরত – সুত্রঃ যুগান্তর।

Leave a Reply