নারী নির্যাতনের দুই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর-শান্তিতে নোবেল

0
5
ডেনিস মুকওয়েগে, নাদিয়া মুরাদ-ফটো সৌজন্যে- প্রথম আলো

শান্তিতে নোবেল পেলেন…
নারী নির্যাতনের দুই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর

সংঘাতময় এই বিশ্বের দুজন অনন্য মানুষকে এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হলো। তঁাদের একজন হলেন আমার বহু পুরোনো বন্ধু কঙ্গোর স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডেনিস মুকওয়েগে, যিনি ঝুঁকি নিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া অসংখ্য নারীকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন এবং তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা করেছেন। আরেকজন হলেন ইরাকের ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মেয়ে নাদিয়া মুরাদ। তিনি নির্যাতিত ইয়াজিদি নারীদের সেবায় অক্লান্তভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।

গণধর্ষণের শিকার হয়ে ক্ষতবিক্ষত হওয়া নারীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ডেনিস মুকওয়েগের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় বুকাভু শহরে তাঁর পিনাজি হাসপাতালে তিনি নারীদের ফিস্টুলা অপারেশন করতেন। (নারীদের প্রস্রাবের রাস্তা ছিঁড়ে পায়খানার রাস্তার সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার রোগের নাম ফিস্টুলা। এতে রোগী প্রস্রাব ধরে রাখতে পারে না। এতে অনবরত প্রস্রাব পড়তে থাকে।) এমন বহু নারীর দেহে অস্ত্রোপচার করে তিনি তাঁদের ফিস্টুলা সারিয়ে তুলেছেন, যাঁদের শুধু প্রসবজনিত কারণে নয় বরং গণধর্ষণ ও ছুরি দিয়ে আঘাত করার কারণে তাঁরা ফিস্টুলায় আক্রান্ত হয়েছেন। প্রথম দিকে তিনি শুধু তাঁদের সারিয়ে তোলার কাজেই ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু পরে তিনি এই এ ধরনের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার আন্দোলন শুরু করেন। ক্রমে ক্রমে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনায় উঠে আসতে থাকেন।

নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন এসব ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের জন্য দায়ী বলে তিনি অভিযোগ করেন। আর এতে তাঁর নিজের দেশ কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলা তাঁর ওপর রুষ্ট হন। প্রতিবেশী রুয়ান্ডার সরকারও তাঁর ওপর খেপে যায়। ২০১২ সালে অস্ত্রধারীরা তাঁর পুরো পরিবারকে জিম্মি করার পর তাঁর ওপর হামলা চালায়। সেই হামলায় তাঁর গাড়ির চালক নিহত হন এবং তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

মুকওয়েগে খুব ভালো করেই জানতেন, তিনি কী করছেন এবং তাঁকে কত বড় বিপদ মাথায় নিয়ে এ ধরনের সংগ্রাম করতে হচ্ছে। কিন্তু তারপরও তিনি সংগ্রামটি চালিয়ে গেছেন। এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার অনেকবার কথা হয়েছে। সেসব কথোপকথনে আমি বুঝেছি, তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসার মতো লোক নন। পশ্চিমে তাঁর কাজ খুবই সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু নিজের দেশে তাঁকে হামলা থেকে রক্ষা করার মতো লোক নেই বললেই চলে। প্রেসিডেন্ট কাবিলা নিশ্চিতভাবেই তাঁর খ্যাতিতে ঈর্ষাকাতর হয়েছেন এবং তাঁকে এ বিষয়ে সহায়তা করবেন বলেও মনে হয় না। এর বড় কারণ হলো, কঙ্গো হয়তো গণতান্ত্রিক পথে যাবে। ধারণা করা হয়, মুকওয়েগে দেশটিতে এতটাই জনপ্রিয় ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় হয়ে উঠেছেন যে তাঁকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান করা হতে পারে।

অন্যদিকে নাদিয়া মুরাদ অন্যভাবে মানবতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাঁর এলাকার কাছে আইএস ২০১৪ সালে হামলা চালিয়েছিল। ইয়াজিদিদের ওপর তারা গণহত্যা চালিয়েছিল এবং নারী ও কন্যাশিশুদের যৌন দাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য অপহরণ করেছিল। তাদের মধ্যে তিনি নিজেও ছিলেন। তবে সৌভাগ্যক্রমে তিনি আইএসের কবজা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। ইয়াজিদিরা খুবই রক্ষণশীল। তাঁদের মধ্যে কেউ যৌন দাসী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকলে এ কথা তাঁরা প্রকাশ করতে চান না। কিন্তু নাদিয়া মুরাদ এই ট্যাবু ভেঙে নিজের দুঃসহ দিনগুলোর কথা প্রকাশ্যে বলেছেন এবং আইএসের এই জঘন্য তৎপরতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজ করেছেন। তিনি তাঁর এবং নারীদের নির্যাতনের কথা সামনে এনেছেন। নাদিয়া ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই চেতনা জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন যে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীর জন্য লজ্জাকর নয়; বরং যে পুরুষটি তাঁকে ধর্ষণ করেছে, তারই লজ্জা পাওয়া উচিত।

নাদিয়া ও মুকওয়েগে নির্যাতন–নিপীড়নের বিরুদ্ধে যেভাবে অবস্থান নিয়েছেন, তা পুরো নির্যাতিতের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে। এমন দুজন মানুষ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন; এটিকে আমি মানবতার জয় ছাড়া আর কী বলতে পারি?
সুত্রঃ প্রথম আলো অনলাইন।

Leave a Reply