বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা

0
18

বাংলাদেশে এ বছরের শেষে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেটির বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করেছে ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ওআরএফ) নামে একটি ভারতীয় থিংকট্যাংক এ নির্বাচন সম্পর্কে একটি বিশ্লেষণ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মনোজ যোশী মন্তব্য করেছেন, এ নির্বাচন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুড়ে দিতে পারে।

মনোজ যোশীর বিশ্লেষণটি বুধবার ওআরএফ প্রকাশ করে। ‘বাংলাদেশ পোলস পোজ এ চ্যালেঞ্জ টু রিজিওনাল স্টেবিলিটি’ নামে এ লেখায় মনোজ যোশী লিখেছেন, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে যে নির্বাচন হয়, সে নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে এবং সে সময় অনেক সহিংসতা হয়। কাজেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আশা বাংলাদেশের এবারের নির্বাচন যেন আগেরবারের চাইতে বিশ্বাসযোগ্য হয়।

বিএনপির ব্যাপারে সন্দেহ : মনোজ যোশী মনে করেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কারও ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাকে ভারত কিছুটা উদ্বেগের চোখে দেখে। এর কারণগুলো তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, ভারত বিএনপির ব্যাপারে সন্দিহান।

বিএনপি এর আগে যে দু’দফা ক্ষমতায় ছিল (১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬) সে সময় বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গিবাদ শেকড় গেড়েছিল। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাকিস্তানের সমর্থন পেয়েছিল। আর বাংলাদেশ এ বিষয়টি না দেখার ভান করেছিল।

বাংলাদেশে যেভাবে ইসলামী জঙ্গিদের তৎপরতা বাড়ছে, এমনকি আত্মঘাতী হামলা পর্যন্ত হয়েছে, সেখানে এ সমস্যা মোকাবেলায় বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগকেই বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করে ভারত।

মনোজ যোশী লিখেছেন, কিছু ভারতীয় কর্মকর্তা বলছেন, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ এবং তৃতীয় দেশগুলোর গুপ্ত সংস্থার তৎপরতা মোকাবেলায় আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তাদের একযোগে কাজ করার অভিজ্ঞতা বেশ ইতিবাচক। তার বলছেন, ইসলামী জঙ্গিবাদ দমনে শেখ হাসিনা খুবই সক্রিয়। অথচ বিএনপি ইসলামী জঙ্গিবাদে যদি উৎসাহ নাও দিয়ে থাকে, তারা এটিকে সহ্য করেছে।

ভারতীয় কর্মকর্তারা অবশ্য একই সঙ্গে এমন দাবিও করছেন যে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির প্রশ্নে তারা নিরপেক্ষ। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গত বছরের অক্টোবরে যখন বাংলাদেশ সফরে যান, তখন যে তিনি বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়া এবং তার দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সেটি তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা : মনোজ যোশী বলছেন, বাংলাদেশে যে নির্বাচন এ বছরের শেষে হওয়ার কথা, সেটাকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক, কিন্তু তারা চায় একটি ‘দলনিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন’র অধীনে এ নির্বাচন হোক, যে কমিশন নির্বাচনকালীন সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে সম্প্রতি তারা ‘কেয়ারটেকার সরকার’র অধীনে নির্বাচনের দাবিতেও আন্দোলন শুরু করেছে।

বিএনপি আশা করছে, ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের যে ক্ষোভ, সেটি তাদের পক্ষে যাবে। তবে বিএনপির নিজের সাংগঠনিক অবস্থা খুব ভালো নেই। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অনেক মামলা ঝুলছে। লন্ডনে বসে এখন দলটি পরিচালনা করছেন তার ছেলে তারেক রহমান।

বিএনপির সাবেক প্রধান মিত্র জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। জামায়াতে ইসলামী এখন আর নিবন্ধিত দলও নয়। কাজেই তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। কিন্তু দলটি তাদের ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্র শিবিরের’ মাধ্যমে এখনও রাস্তায় লোক জড়ো করার ক্ষমতা রাখে।

নির্বাচনে শেখ হাসিনার সমস্যা মূলত দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা থেকে উৎসারিত। এছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যদিও ভালো করছে, ভারতের চেয়েও তাদের প্রবৃদ্ধি ভালো, তারপরও সরকারের ভেতর অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে যা সহজে কাটানো যাচ্ছে না।

মনোজ যোশীর উপসংহার হচ্ছে, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ হয়তো তুলনামূলকভাবে একটি ভালো অবস্থানে আছে। কিন্তু ভবিষ্যতে নতুন ধরনের খুবই সহিংস এক ইসলামী জঙ্গিবাদ দেশটিকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে।

ওআরএফ কারা চালায় : ওআরএফ ভারতের একটি সুপরিচিত থিংকট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ওআরএফ নিজেদের ‘স্বাধীন’ দাবি করলেও ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্সের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রিলায়েন্স গ্রুপ এ থিংকট্যাংকের অন্যতম স্পন্সর। একই সঙ্গে ভারত সরকারের সঙ্গেও বিভিন্ন বিষয়ে একযোগে কাজ করে ওআরএফ।

প্রতি বছর নয়াদিল্লিতে ‘রাইসিনা ডায়ালগ’ নামে বহুপাক্ষিক সম্মেলন হয়। ওআরএফ সেটির মূল আয়োজক। আর এতে সহায়তা করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ সম্মেলনে মূলত ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনীতি নিয়ে নীতিনির্ধারকরা আলোচনায় অংশ নেন।

ভারত সরকারের আঞ্চলিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ওআরএফ এখন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মনে করা হয়। ওআরএফ এর ফেলো মনোজ যোশী ভারতের খুবই সুপরিচিত একজন সাংবাদিক এবং তিনি ভারত সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক টাস্কফোর্সের একজন সদস্য ছিলেন।

সুত্রঃ যুগান্তর/ বিবিসি বাংলা।

Leave a Reply