লক্ষ্যের চেয়ে পিছিয়ে মেট্রোরেলের কাজ!

0
22

প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত থাকলেও রাজধানীর একাংশে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই মেট্রোরেল চালু করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরাও। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পের ভায়াডাক্ট ও স্টেশনের কাজ এগিয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ। বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রকৌশলের দরপত্রের কাজও এখনো শেষ হয়নি। ডিপোর ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষ হলেও সেখানে পূর্ত ও ভবন নির্মাণের কাজ হয়েছে ২ শতাংশ।

নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-৬ হবে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। এর মধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশে (১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার) ২০১৯ সালের মধ্যে ট্রেন চালু করতে চায় সরকার। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে আটটি প্যাকেজে। এ অংশে ২০১৯ সালের মধ্যে ট্রেন চালু করতে হলে আট প্যাকেজের ৭টিই এ সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের দরকার পড়বে।

চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পের প্যাকেজভিত্তিক অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্যাকেজ-১-এর আওতায় ডিপোর ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষ। প্যাকেজ-২-এর আওতায় ডিপো এলাকার পূর্ত ও ভবন নির্মাণ কাজের অগ্রগতি হয়েছে ২ শতাংশ। ৩ ও ৪ নম্বর প্যাকেজে চলছে উড়ালপথ ও স্টেশন নির্মাণের কাজ।

উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মূল লাইনটি হচ্ছে এ দুই প্যাকেজে। এ অংশে মোট নয়টি স্টেশন থাকবে। স্টেশনগুলো হলো— উত্তরা (নর্থ), উত্তরা (সেন্টার), উত্তরা (সাউথ), পল্লবী, মিরপুর ১১, মিরপুর ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আগারগাঁও। একই অংশে ১২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের উড়ালপথ নির্মাণ করা হবে। উত্তর (নর্থ) থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত সবক’টি স্টেশন হবে উড়ালপথের ওপর।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, এ অংশের ২ হাজার ২৩৮টি পাইলের মধ্যে নির্মাণ শেষ হয়েছে ৪৩৯টির। ৩৮৩টি চেক বোরিংয়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে ২৪৭টির। জানুয়ারি পর্যন্ত এ প্যাকেজের অগ্রগতি ৩ শতাংশ।

প্যাকেজ-৭-এর আওতায় লাইনের বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রকৌশলের কাজ করা হবে। এ কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। মেট্রোরেল প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দরপত্র কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাইকার কাছে পাঠানো হয়েছে। প্যাকেজ-৮-এর আওতায় রোলিং স্টক (ট্রেন) ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করা হবে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ কাজের অগ্রগতি ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

সরকারের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) সুপারিশের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে এমআরটি লাইন-৬। আরএসটিপি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। এমআরটি লাইন-৬-এর মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ধরা হলেও সংস্থাটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, ২০১৯ সালের মধ্যেই লাইনটির একাংশে ট্রেন চালু করা সম্ভব। এ সম্পর্কে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ আহম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ২০১৯ সালের মধ্যে যেন লাইন চালু হয়, সেজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি, এ সময়ের মধ্যেই লাইনটির এ অংশে ট্রেন চালু করা সম্ভব হবে।

মেট্রোরেল প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিকও মনে করছেন, ২০১৯ সালের মধ্যেই এমআরটি লাইন-৬-এর একাংশে ট্রেন চালু করা সম্ভব।

এদিকে প্রকল্পের বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রকৌশলের দরপত্রের কাজ শেষ না হওয়ায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা অব্যয়িত থেকে যাচ্ছে। এ কারণে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের চলতি অর্থবছরের আরএডিপির শতভাগ বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মেট্রোরেল প্রকল্পের বছরভিত্তিক ব্যয় পরিকল্পনায় দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) এ প্রকল্পে ৩ হাজার ৪২৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে প্রকল্প সহায়তা থেকে বরাদ্দ দেয়া হয় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এখনো বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রকৌশলের কাজ শুরু না হওয়ায় বরাদ্দ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা অব্যয়িত থেকে যাবে।

এ বিপুল পরিমাণ টাকা অব্যয়িত থাকার বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভাতেও আলোচনা হয়েছে। সভায় প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে প্যাকেজ-৫, ৬ ও ৭-এর দরপত্র প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন, আরএডিপির বরাদ্দ অনুযায়ী অর্থ ব্যয়সহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (আরডিপিপি) প্রকল্প সাহায্য থেকে প্রাপ্ত ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা অব্যয়িত থাকবে। এর ফলে বিভাগের আরএডিপি শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।

এ সম্পর্কে মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক আফতাব উদ্দিন তালুকদার বলেন, প্যাকেজ-৭-এর দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে। নেগোসিয়েশন শেষ হলে অব্যয়িত অর্থ সেখানে ব্যয় করা যাবে।

প্রসঙ্গত, ১৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৬ বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ও ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।

২০১৯ সালের মধ্যে রাজধানীতে মেট্রোরেল চালুর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিকে বাস্তবসম্মত হিসেবে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ২০১৯ সালের মধ্যে রাজধানীর একাংশে মেট্রোরেল চালুর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, আমি মনে করি তা পুরোপুরি না হলেও পরীক্ষামূলক চলাচলের জন্য হলেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এজন্য অভ্যন্তরীণ পরিষেবা স্থানান্তর, ডিপো, ভায়াডাক্টের কাজগুলো দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। স্টেশন নির্মাণের কাজটা একটু জটিল। তারপরও আমি মনে করি, সবগুলো কাজ ঠিকমতো ও দ্রুততার সঙ্গে চললে ২০১৯ সালে রাজধানীতে মেট্রোরেল চালু করা সম্ভব। সুত্রঃ বণিক বার্তা।

Leave a Reply