সময় এখন নারীর!

0
16
আন্তর্জাতিক নারী দিবস

সময় এখন নারীর- উন্নয়নে তারা, বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরের কর্মজীবনের ধারা। এ বছর ‘প্রেস ফর প্রোগ্রেস’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০১৮।

প্রাচীন মানবেতিহাসের আলোচনায় আমরা নারীর অবস্থানের অকথ্য নির্যাতনের চিত্র পাই। যেখানে নারীকে শুধু সন্তান উৎপাদনের একটা যন্ত্র বা ভোগের পণ্য হিসেবে গণ্য করা হতো। এমনকি সভ্য সমাজ নামে খ্যাত গ্রিক, রোমান ও খ্রিষ্ট সমাজেও নারীর কোনো সামাজিক মর্যাদা বা অধিকার ছিল না। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের নারীদের কোনো ভোটাধিকার ছিল না!

মহান আল্লাহ বলেন- ‘নারী-পুরুষ একে অপরের পোশাকস্বরূপ।’ পোশাক ও দেহের মধ্যে যেমন কোনো ফারাক থাকে না, তেমনি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও কোনো তফাত থাকে না। কিন্তু বর্তমানে এ থেকে দূরে সরে আসার কারণে দিন দিন তৈরি হয়েছে এক বৈরী পরিবেশ, অসমান্তরাল চিত্র।

নারীই কিন্তু প্রথম ফার্মার। নারীই আবিস্কার করল বীজ থেকে বৃক্ষের জন্মরহস্য। অসুস্থ থেকে সুস্থতার এবং ঔষধি থেকে ঔষধ। বাসগৃহের ভিত্তিতেও ছিল প্রথম নারী এবং নারীর গর্ভেই জন্ম নেয় প্রথম কৃষক। অর্থাৎ কৃষি শ্রমিক। এভাবেই বিশ্বের যা কিছু প্রথম তার আবিস্কারক নারী। অথচ বর্তমানে এ দেশের একটি প্রচলিত ভাষ্যমত হচ্ছে, ‘না, কিছু করি না। অথবা না, সে কোনো কাজ করে না।’ কয়েক ঘণ্টা কাজের বিনিময়ে গৃহকর্মীকে আমরা ঠিকই মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক দিই। কিন্তু ঘরের স্ত্রীকে ২৪ ঘণ্টা সেবাদানের বিষয়টিকে সেভাবে মূল্যায়ন করি না।

গবেষণা ও বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একই প্রতিষ্ঠানে একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে একই পদমর্যাদায় চাকরি করেন। নারী কর্মীটি যদি অধিক মেধাবী, অধিক যোগ্যতা এবং সততায় তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে যথাযোগ্য কর্মদক্ষতায় পুরুষ সহকর্মীটির থেকে এগিয়ে থাকেন, তার মেধা বা যোগ্যতাকে সদর্থকভাবে প্রকাশ না করে তাদের যোগ্যতাকে আড়ালে-আবডালে কুরুচিপূর্ণভাবে ইঙ্গিত করা হয়। নারীর অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করতে বদলাতে হবে পুরুষতান্ত্রিক এই দৃষ্টিভঙ্গি। তাকে নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশে ব্র্যাক পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বিবাহিত নারীর ৮২ ভাগই নির্যাতনের শিকার। এ গবেষণায় ১০,৫৯৬ জন নারীর নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ নির্যাতনের শিকার হয় পরিবারের সদস্য কর্তৃক, ১৪ শতাংশ প্রতিবেশী কর্তৃক, ৬ শতাংশ পরিচিত এবং ৩ শতাংশ আত্মীয়ের মাধ্যমে নির্যাতিত হয়। শারীরিক নির্যাতন ৬১ শতাংশ, আত্মহত্যা ৮ শতাংশ, ধর্ষণ ৮ শতাংশ, মানসিক নির্যাতন ৭ শতাংশ। আমরা জানি, নারী সুরক্ষায় কঠিন আইন আছে। তারপরও নারী নির্যাতন কমছে না। দিন দিন নতুন নতুন রূপে নারী নির্যাতন ঘটছে। চলন্ত বাসেও নারীকে সল্ফ্ভ্রম হারিয়ে মৃত্যুর ঠাণ্ডা শীতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে হচ্ছে। আধুনিক সময়ে দিনরাত্রি নির্বিশেষে নারীকে নানা প্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে যাতায়াত করতে হয়। সেক্ষেত্রে তাদের নানা কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত এবং অশ্নীল মনোভঙ্গির মুখোমুখি হতে হয়।

আমরা জানি, একটি ছেলে যতটুকু জানে, একটি মেয়েও ঠিক ততটুকুই জানে। কখনও-সখনও তারা আরও বেশি কিছু জানে। তাছাড়া তাদেরকে পেশাগত দায়িত্ব ছাড়াও অনেক বেশি কিছু করতে হয়। সংসার, সন্তান ধারণ, সন্তান পালন, যা কখনও একটি ছেলের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তারপরও কথায় কথায় ছেলেটি তাকে এ কথা বলতে ছাড়ে না যে, আজ তুমি কী কাজ করেছ? কোনো কাজই তো করোনি! অথচ সে কিন্তু সবই জানে যে, পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে তার স্ত্রীই সব করে। আজ সংসারে কী রান্না হবে বা কেনাকাটায় কী কী প্রয়োজন থেকে শুরু করে গৃহকর্মীকে তদারকিও তাকেই করতে হয়। একটি সংসারের শিক্ষা, চিকিৎসা, বিবাহসহ যাবতীয় সিদ্ধান্ত স্ত্রীকেই নিতে হয়। তারপরও স্বামী তাকে কথার খোঁচায় ঘায়েল করতে ছাড়েন না। তাকে তো জিততে হবে! সংসারের মতো কর্মক্ষেত্রেও আমরা একই চিত্র দেখে থাকি।

বর্তমান প্রেক্ষিতে নারীরা আজ অনেক এগিয়ে। নারীরা আজ গণিতবিদ, প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলী। কৃষিশিক্ষা বিশেষ করে ছাদ-কৃষিতে, ফুল চাষে এবং উদ্যোক্তা হিসেবে নারীরা এখন বিশেষ সাফল্যের দাবিদার। বিজ্ঞানশিক্ষা থেকে তথ্যপ্রযুক্তির নানা সেক্টরে তাদের সরব দক্ষতা আজ বাংলাদেশের বিশেষ অর্জন। আদমশুমারিতে নারী ভোটার যেমন এগিয়ে, তেমনি পরীক্ষার ফলেও নারীরা এগিয়ে আছে পুরুষের চেয়ে, কর্মদক্ষতাতেও একই চিত্র। তাই বাংলাদেশের অর্ধেক পুরুষ আর অর্ধেক নারীর সবটুকু শ্রম আর অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে আগামীর বাংলাদেশ এবং বদলে যাচ্ছে গ্রাম, শহর ও এর প্রতিটি ইঞ্চি। তাই আমাদের চোখে আজ নতুন দিনের স্বপ্ন, নতুন দিনের আকাঙ্ক্ষা। একজন নারী হিসেবে এ গর্ব এবং অহঙ্কারের দাবি আমাদেরও।
সুত্রঃ সময়।

Leave a Reply