‘৭ দফা দাবি আদায় না করে ঘরে ফিরব না’-জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট!

0
11
চট্টগ্রামে ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশে নেতৃবৃন্দ ফটো সৌজন্যে- সমকাল

সাত দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। সরকারের কঠোর সমালোচনা করে তারা বলেছেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সংসদ ভেঙে দিয়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। আর ২০১৪ সাল থেকে সরকার যত সংবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে, সব ঘটনার জন্যই তাদের জবাবদিহি করতে ও শাস্তি পেতে হবে। সাত দফার পক্ষে সিলেট ও চট্টগ্রামের জনগণ রায় দিয়েছে। এ রায় উপেক্ষা করলে আপনারা এমন শাস্তি পাবেন, তা কল্পনাও করতে পারবেন না।

শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের সমাবেশে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এসব কথা বলেন। নগরীর কাজীর দেউরীর নাসিমন ভবনে নগর বিএনপি কার্যালয়ের সামনে নূর আহমদ সড়কে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া না হলে প্রতি ঘণ্টার জন্য সরকারকে শাস্তি পেতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেন বলেন, জনগণই হচ্ছে দেশের প্রকৃত মালিক। সরকার হচ্ছে সেবক। আজ চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে জনসভা করতে দেওয়া হয়নি। এ জন্য মানুষের এ কষ্ট হচ্ছে। লালদীঘি ময়দান কেন দেওয়া হয়নি- এটার জবাব দিতে হবে। এটা কারও বাপ-দাদার সম্পত্তি নয়। জনগণ এটার মালিক। জনগণকে কষ্ট দিয়ে সংবিধান অমান্য করা হচ্ছে। এজন্য সরকারের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হবে। শাস্তি দেওয়া হবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা মেনে নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জনরায় উপেক্ষা করলে সরকার যে শাস্তি পাবে তা তারা কল্পনা করতে পারবে না।

বক্তব্যের একেবারে শেষে খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি চান তিনি। ড. কামাল হোসেন আরও বলেন, ‘২০১৪ সালে নির্বাচনকালে বলা হয়েছে, সংকট কাটাতে সে নির্বাচন করা হয়েছে। কিন্তু এরপর পাঁচ বছর কাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের দৃষ্টিতে এটা গুরুতর অপরাধ। যারা অপরাধ করেন, তারা ভাবেন অপরাধ করে পার পেয়ে গেছি; কিন্তু এবার পার পাওয়া যাবে না।’

লালদীঘি মাঠে সমাবেশ করতে না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় ড. কামাল হোসেন সমাবেশে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, হাত তুলে বলুন, আমরাই দেশের মালিক। নেতাকর্মীরা হাত তুলে তার এ কথার প্রতি সমর্থন জানান। এর পর তিনি বলেন, ‘দেখে যান, দেশের মালিক জনগণ রুখে দাঁড়িয়েছে।’ সমাবেশে মানুষ যে কষ্ট পাচ্ছে তার একটি ছবি নেতাদের কাছে চান এ সংবিধানপ্রণেতা। এ ছবি দেখিয়ে আদালতে মামলা করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধান বক্তার বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরব না। অনেক মামলা হয়েছে। অনেক ভৌতিক মামলাও দেওয়া হয়েছে। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধেও মামলা দেওয়া হয়েছে। মামলা দিয়ে লাভ হবে না। অন্যায়ের কাছে পরাজিত হবো না। নেত্রী জনগণকে নিয়ে স্বৈরাচার সরকারকে হটাতে বলেছেন। স্বৈরাচার সরকারকে হটিয়েই আমরা ঘরে ফিরব।

তিনি আরও বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করুন। জনগণ যাকে ভোট দেয় মেনে নেব; কিন্তু আপনারা জানেন, আপনাদের ভাঙা নৌকায় জনগণ আর উঠবে না। কোনোদিন কোনো স্বৈরাচারী সরকার অস্ত্র ও গায়ের জোরে টিকে থাকতে পারেনি, বর্তমান সরকারও টিকে থাকতে পাবে না বলে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল।

সরকার সব সময় নাশকতার কথা বললেও সরকারই নাশকতা সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আওয়ামী লীগ ও সরকার জনগণকে ভয় পায়। এজন্য ২৫ শর্ত জুড়ে দিয়ে সমাবেশ করতে নূর আহমদ সড়কের অর্ধেক রাস্তা দিয়েছে। লালদীঘি মাঠ দেওয়া হয়নি। অধিকার ফিরে পেতে মানুষ লড়াই করছে।

জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। দাবি আদায়ে সারাদেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামতে হবে। তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া না হলে বুঝতে হবে, সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন চায় না।’

সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর ঘোষণা দিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সরকার ঐক্যের পথে বিভ্রান্তি ছড়াবে। আমরা অনেকগুলো দল এক হয়েছি। আমাদের লক্ষ্য একটাই- সরকারের পতন। তারা হঠাৎ তফসিল ঘোষণা করতে পারে। আমরা লড়াই করব এবং ভোটে জিতব। ভোটকেন্দ্রে, ভোটের মাঠে, রাজপথে ঐক্যবদ্ধ থাকব। জয় আমাদের হবেই। তিনি বলেন, গদি না ছাড়লে কীভাবে ছাড়াতে হয় সেটা আমাদের জানা আছে।

আমরা কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়েছি, আমাদের দাবি মানতে হবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ১০ দিনের মধ্যে দেশের পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে। এ সময়ের মধ্যে দেশের সব বুদ্ধিজীবী ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেবেন। বামপন্থি, আওয়ামীপন্থি সব বুদ্ধিজীবী আসবেন। শুধু ১০ দিন অপেক্ষা করুন, দেখুন কী হয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ একটি অসহিষ্ণু ও স্বৈরাচারী রাজনৈতিক দল। তাদের স্বৈরাচারীর কারণে ভোটের অধিকার হারিয়েছি, আইনের শাসন হারিয়েছি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হারিয়েছি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হারিয়েছি। এ সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো জাতীয় ঐক্য। এ ঐক্যেই সরকারের পতন হবে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যা করেনি আপনারা তাই করেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিদায়ের সময় হয়ে গেছে। জনগণের বিপক্ষে গেলে একদিন জনগণের আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।’

সরকার দেশে বাকশাল কায়েম করতে চায় উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সমাবেশের মঞ্চে ও মঞ্চের সামনে এমন কেউ নেই যাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়নি; কিন্তু জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। জনতার বাঁধ ভাঙা ঢেউ থেকে রক্ষা পাবেন না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেন, ‘দাবি আদায়ে রাজপথে নেমেছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকব।’

কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম ২০ দলীয় জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে রয়েছে বলে সমাবেশে ঘোষণা দেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকে শুরু করে যেভাবে একদলীয় নির্বাচন অতীতে করা হয়েছে, এ ধরনের নির্বাচন বাংলাদেশের মাটিতে আর করতে দেওয়া হবে না।

বিএনপির চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, নাগরিক ঐক্যের সদস্য সচিব মোস্তফা আমিন, এলডিপি মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, মীর মো. নাছির উদ্দীন, তানিয়া রব, বিএনপির উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, জয়নাল আবেদীন ফারুক, ড. সুকোমল বডুয়া, বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দীন খোকন, জেএসডির কেন্দ্রীয় নেতা জহির উদ্দীন, খায়রুল কবির খোকন প্রমুখ।

এদিকে ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানানো হলেও নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল নির্বাচনী আমেজ। বিভিন্ন নেতার নামে ‘এমপি হিসেবে দেখতে চাই’ লেখা সংবলিত ব্যানার ঝুলতে দেখা গেছে। খালেদা জিয়াসহ কারাগারে বন্দি বেশ ক’জন নেতার মুক্তির দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ডও বহন করেন কর্মীরা। সড়কের একপাশে জনসভার অনুমতি দেওয়া হলেও অন্যপাশে সীমিত আকারে গাড়ি চলাচল করেছে। মানুষের উপচেপড়া ভিড়ের কারণে ব্যাহত হয়েছে যান চলাচল।

পুলিশের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী বিকেল ৫টার মধ্যে সমাবেশ শেষ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এ কর্মসূচি ঘিরে ছিল পুলিশের কড়া পাহারা। পুলিশ মোতায়েন ছিল নগরের বিভিন্ন স্থানেও। পাশাপাশি সাদা পোশাক ও গোয়েন্দা পুলিশ ছিল তৎপর। বিভিন্ন পয়েন্টে লোকজনকে তল্লাশি চালাতেও দেখা গেছে। নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (দক্ষিণ) আবদুর রউফ সমকালকে বলেন, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে না হয় সে জন্য জনসভার আশপাশ ঘিরে প্রায় আড়াইশ’ পুলিশ মোতায়েন ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

শনিবার সকালে চট্টগ্রামে পৌঁছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। নগরের জেল রোডে আমানত শাহ মাজার জিয়ারত করেন তারা।
// সুত্রঃ সমকাল//

Leave a Reply